আমার সম্পাদক :কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর
সৈকত দে
১
২০০৬। ঘুড়ি,আসমা বীথি সম্পাদিত পত্রিকায় একটা 'সেইরকম' ক্রিটিক লিখলাম। 'শহরটির কোনো ম্যাপ ছিলো না'- গল্পটা একাধিকবার ছাপা হয়েছে,লিখলাম' এটা কি ওষুধের বিজ্ঞাপন?' বয়স কম,স্পর্ধা বেশি। গল্পটা কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের। মূলত নামটির সাথে তখন পরিচয়।
একই বছরের শেষ দিকে,আমি তখন বিশদ বাংলার বইঘরে কাজ করি,যতটা না পয়সার দরকারে তার চেয়ে বেশি মানুষ দেখবার দরকারে। দেখি,একদিন সন্ধ্যায়,একটা লোক এসে জিজ্ঞেস করছেন,'আপনি কি সৈকত দে?' বললাম,হ্যাঁ। 'আপনি চন্দ্রাবতী' কাগজটা পড়েছেন?' বললাম, 'পড়েছি'। বললেন, তাহলে কথার জন্য লেখেন। আমার পত্রিকা কথা।
এই হলো কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সাথে প্রথম আলাপ। সেই অকালপক্ক তরুণ 'চন্দ্রাবতী' না পড়েও পড়েছে বলেছিলো কেননা তখন নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখবার একটা মোহ ছিলো। সেখানে আন্না আখমাতোভা,সোভিয়েত কবিকে নিয়ে লিখতে গিয়ে একটু সমালোচনা করেছিলাম রুশ সমাজতন্ত্রের। উনি ফোনে জিজ্ঞেস করলেন,পালটানো যায় কিনা। অই যে বললাম, স্পর্ধা বেশি ছিলো। বললাম,অবিকৃত ছাপা লাগবে। এবং কী আশ্চর্য! আপত্তি না করে ছেপে দিলেন। আরো আশ্চর্য,আগের অই ঘুড়ির রিভিউয়ের কথা তুললেন না। এই সহিষ্ণুতা বিরল,অতি বিরল।
২
আস্তে আস্তে আমি 'কথা'-র নিয়মিত লেখক হই। তিনি একদিন বললেন, 'মহিষকুড়ার উপকথা' পড়তে,আমি পড়ে নন্দনের আনন্দ পেলাম। উনাকে বললাম,'আমি ও বনবিহারী' পড়তে। উনিও আনন্দ পেলেন। এই আনন্দ এমন গভীর যে তিনি 'কথা'-য় সন্দীপন ক্রোড়পত্র করলেন। লেখা নিয়ে তাঁর সাথে ইঁদুরবিড়াল দৌড় চলতো। তিনি আমাকে প্রচুর বকাঝকাও করতেন। বলতেন,'কথা ঠিক না থাকলে কোনোদিন বড়ো লেখক হতে পারবেনা', আরো বলতেন, টাইম ম্যানেজমেন্ট শেখো। ফেসবুক কমাও। কয়েকটা স্মৃতি পরপর বলি:
এক। তাঁকে বলতাম, 'কথা'-র সেরা কাজ হচ্ছে সাক্ষাৎকারগুলো। এত বিশদ ও আন্তরিক কাজ বিরল। একদিন উনি বললেন,হাসান জাফরুলের লেখা পড়েছো? নাম শোনা ছিলো, বন্ধু ঋপণ পরামানিকসূত্রে। বললাম,পড়ি নাই। পড়তে দিলেন 'ইউনুস আখ্যানপর্বে স্বপ্নদোষ'। শেষ হলে বললেন,কেমন লাগলো? বললাম,ভালো। বেশ ভালো। তারপর দিলেন,সুমন রহমানের 'গরিবি অমরতা'। একইভাবে ভালোমন্দ জানলেন তাঁর রেলওয়ে হাসপাতালের অফিসরুমে বসে। তারপর একদিন বললেন,এই দুইটা বই নিয়ে লেখো। তিনি কিন্তু লেখকের উপর সম্পাদক বলে কিছু চাপিয়ে দিতেন না। আলোচনা করতেন দীর্ঘ সময় নিয়ে। লেখকের প্রবণতা ও আলোচকের লেখার ধাত বোঝার চেষ্টা করতেন। এইভাবে কথা পত্রিকায় অন্তত আমার লেখাগুলো লেখা হয়েছে। ষষ্ঠ লেখায় লেখাটা যত্নে ছেপেছিলেন।
দুই। শাহাদুজ্জামানের লেখাপত্র নিয়ে দীর্ঘ গদ্য একাধিকবার ডেট লাইন ফেল করার পরে তিনি আমার তৎকালীন কর্মস্থলে এসে বেশ বকাবাদ্য করলেন। সেদিনই সন্ধ্যায় বাতিঘরে 'কেশের আড়ে পাহাড়' এসেছে,শাহাদুজ্জামানের নবতম গল্পবই। কিনে প্রথমা বইয়ের দোকান, এনে রেখেছি। বললাম, লেখাটার শেষে এই সদ্যপ্রকাশিত বইয়ের আলোচনা জুড়তে চাই। তিনি আরো রেগে গেলেন। এমনিতেই পারছো না। কাল লেখা না দিলে আর কথা বলবো না তোমার সাথে। আমার সেদিন রাতে আবার মদ জুটে গেলো। তখন প্রচুর মদ খেতাম। রাত দুইটার দিকে বাসায় ঢোকার পর, হাতে মুখে জল দেয়ার সময় মাতালমাথায় মনে পড়লো প্রতিশ্রুতিটা ও চিরকাল কথা না বলবার হুমকি। এক মগ কফি বানিয়ে আমি ঘুম ও নেশা তাড়ালাম আর বইটা নিয়ে বসলাম। ভোরের দিকে দেখা গেলো, আমি আমার লেখার শেষ অংশের ফুটনোটে জুড়ে দিচ্ছি এই বইয়ের আলোচনা। সকাল হতে নাস্তা করে, চল্লিশ মিনিট হেঁটে তাঁর রেলওয়ে হাসপাতালের অফিসে লেখা দিয়ে আসি। তাঁর সেই দরাজ হাসি ও মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়া ভেবে আজো মাঝে মাঝে চোখ ঝাপসা হয়। কিন্তু তবু,আমি তো কথা রেখেছিলাম, জাহাঙ্গীর ভাই আর কথা বলবেন না। সপ্তম সংখ্যার সেই লেখাটা স্বয়ং শাহাদুজ্জামানের ভারি পছন্দ হয়েছিলো। এইভাবে নরমে গরমে তিনি লেখা বার করে আনতেন লেখকের কাছ থেকে।
তিন। শহীদুল জহিরের প্রয়াণের পর টানা এক বছরের বেশি আমাদের জাহাঙ্গীর ভাই একেবারেই চুপ মেরে যান। একদম। মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখতাম। এত ম্লান তাঁর মুখ। তখন অনেকদিন কোনো দৈনিক/লিটল ম্যাগে তাঁর লেখাও দেখিনি। কথার ভেতর একধরণের ক্লান্তি খেয়াল করতাম। তিনি কোনোভাবেই প্রিয় বন্ধুলেখকের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না। আমি ভাবতাম,এভাবেও ভালোবাসা যায়! আসলে তিনি ভালোবাসতে পারতেন আন্তরিকভাবে। অন্তত একদিন তাঁর সাথে মিশলে,হাত মেলালে অই উষ্ণতা তাঁর স্মৃতির অক্ষয় সম্পদ থেকে যাবে।
চার। আরেকবার মনে আছে, ফেব্রুয়ারি পাঁচ ২০১৩তে,গণজাগরণের শুরুর দিন সকালে লেখা জমা দিলাম। সেদিন প্রয়াত আমার পার্টি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের প্রশ্ন তুলে দলত্যাগী নেতা আব্দুল্লাহ সরকার মারা যান। লেখাটি আমি নেতাকে উৎসর্গ করি। মনে পড়ে, একজন সমব্যথীর মতই তিনি জানতে চেয়েছিলেন,এই নেতা সম্পর্কে আমার জানাটা। এইভাবে,জানতে চাওয়া জানার আগ্রহটা পরিচির বৃত্তে আর মাত্র দুজন অগ্রজে দেখি। একজন কিছুদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন,আমাদের শহরের তরুণদের প্রেমের মানুষ সিদ্দিক আহমেদ আর অন্যজন শিক্ষক,লেখক ফেরদৌস আরা আলীম।
পাঁচ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ আমাদের পার্টি পালন করতে রাজি না হলে,আমাদের অধুনাবিলুপ্ত জাগরণসম্ভব কাগজ 'নাব্যিক' একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শহরের বিশিষ্টজনদের নিয়ে এক বিকেলে। তিনিও আমন্ত্রিত ছিলেন। আলোচনা করেন সুন্দর। কেবল তা-ই নয়,পরের 'কথা' পত্রিকায় এই অনুষ্ঠান নিয়ে বিশদ গদ্য লেখেন। আরো পরে তাঁর গদ্যের বইতেও এই গদ্যকে স্থান দিয়ে তরুণতরদের প্রতি তাঁর প্রেমবাসনাকেই জানান দিয়ে যান।
৩
আসুন, এবার একটু অন্য কথা বলি। প্রথম সংখ্যা 'কথা' প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। এখানে সম্পাদকীয়র একটি লাইন :' যে কোনো কাগজের প্রতিক্রিয়াশীলতা আমরা ঘৃণা করি'। চতুর্থ সংখ্যার ১৬৭ পাতায় লেখা হয় : ' সমাজ,রাষ্ট্র আর তার সমূহ জগতকে চিনতে ছোটকাগজ পড়ুন, অন্যকেও পড়তে উদ্বুদ্ধ করুন।' ষষ্ঠ সংখ্যায় লিটল ম্যাগাজিন গবেষক কমলেশ দাশগুপ্তের তথাকথিত লিটল ম্যাগাজিন মেলা নিয়ে সমালোচনামুখর হলেন জাহাঙ্গীর ভাই। সেদিন আমি উপস্থিত ছিলাম। কমলেশ বাবুর ভূমিকা ন্যাক্কারজনকই ছিলো। আমাদের শহরেরই একাধিক লিটলম্যাগ কর্মী পদকের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলো এবং জাহাঙ্গীর ভাইয়ের নাম আলোচক সূচীতেও থাকার পরেও ডাকা হয়নি। সপ্তম সংখ্যায় দেখলাম,একটু পাল্টেছেন সম্পাদক। বলছেন,' এই যে এনজিও,কর্পোরেট পুঁজি,অনলাইন সাহিত্যের আগ্রাসী প্রচারণা,ধর্মীয় জঙ্গিত্বের হুঙ্কার,যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিতকরণে মাঠগরমের রাজনীতির ভেতর ছোটকাগজও হচ্ছে! তবে আমরা বরাবরই ছোটকাগজের মেজাজকে লালন-পালনের কথা বলি-সেটা হোক লিটল ম্যাগাজিন,সাহিত্য পত্রিকা কিংবা সাময়িকীর পাতা।' যিনি ২০০৪ সালে কাগজের প্রতিক্রিয়াশীলতাকে ঘৃণা করবার কথা বলেছিলেন,তিনি আট বছর পরেই মাত্র ২০১২ সালে সাময়িকীর পাতাতেও চাইছেন 'ছোটকাগজের মেজাজ'। অথচ কোনো কোনো দৈনিকের ও তার সাময়িকীর প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র সম্পর্কে তো তিনি অনবগত নন! এই ২০১২ সালে মনটা প্রথমবারের মতন খারাপ হলো ও ২০১৩ সালে আবারো,ভালোবাসি বলে লেখা দিই ও তিনি যত্ন করে ছাপেন।
৪
কমলকুমার সংখ্যা হবে। তাঁর সম্পাদনায় শেষ সংখ্যা 'কথা'-র,তখনো তাঁর মাথায় অনেক পরিকল্পনা কেননা নিয়তির পরিকল্পনা আমরা।কেউই জানি না। তার আগে আমরা ভাবছিলাম, একটা শ্যামলের ক্রোড়পত্র করা যায় কি না। আমি 'কৌরব' পত্রিকার কমল চক্রবর্তীর লেখা তাঁকে পড়ালাম। কৌরবের অতি বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক খালাসীটোলা সংখ্যা পড়ে তিনি গভীর আপ্লুত হন। আনবো আনবো করে আর আনা হয়নি। যেমন,তাঁর দুটো বই আমার কাছে রয়ে গেছে। তো, জাহাঙ্গীর ভাই দেখি প্রথম আলোর নানা লোকজনের কথা ভাবছেন,লেখা নেবেন বলে বলছেন। আমি একবার হালকা করে বলেছিলাম, গণজাগরণের সময় তাদের ভূমিকা ভুলে যাবেন না প্লিজ। অন্তত লাকী আক্তার নিয়ে হাসনাত আব্দুল হাই নিয়ে লেখা বিচ্ছিরি গল্পটা। তিনি স্বভাবসুলভ ঠাট্টায় উড়িয়ে দিলেন। একদিন বললাম, আমার কাছে কমলবাবুর দু একটি দুষ্প্রাপ্য জিনিস আছে। রিপ্রিন্ট করা দরকার শতবর্ষের উছিলায়। তিনি বললেন,জানাবেন। তারো কিছুদিন পর একটি প্রশ্নমালা মেল করেন। আমি হাতে লেখা উত্তর নিয়ে যাই। তিনি একটি উত্তরে আপত্তি জানান। আমাকে এই প্রথমবার বললেন,লেখা পাল্টাতে। আমি সবিনয়ে জানাই, তাহলে এইবার থাক। পরেরবার হবে। সেদিনও হাসাহাসি করেই,যদিও তাঁর খানিক মুড অফ ছিলো,প্রসঙ্গ শেষ হয় ও আমি আমার কাজের জায়গায় ফিরি। তখন একটা কম্পিউটার এক্সেসরিজের ব্যবসা করবার চেষ্টা করছিলাম। পারিনি। যথাসময়ে 'কথা' প্রকাশসংবাদ শুনেই আমি একছুটে বাতিঘর যাই,সন্ধ্যায় ও নিয়ে আসি। এবং ঘুমোবার আগে শেষ করে একটি ফেসবুক পোস্ট দিই ও তিক্ত বিতর্কের পর জাহাঙ্গীর ভাই আমাকে ব্লক করেন। পুরো ইতিহাসটি কপি করে তুলে দিচ্ছি
'আমার কথা আলোচনা
'কথা' পত্রিকা নিয়ে ভেবেছিলাম বিশদে বাংলায়,বিস্তারে লিখবো কিন্তু পড়তে পড়তে ভাবলাম লেখার কিছু নেই... গড়ে প্রতি পেজে একটি বা তার বেশি বানান ভুল...মুদ্রণ তদারক করেছে 'খড়িমাটি',তারা সুবিচার করেনি তাদের এতোদিনে গড়ে ওঠা কিছু সুনামের প্রতি...আরো বেদনার তারা কমলকুমারের এক ইন্টারভিউ সরাসরি স্ক্যান করে বসিয়ে দিয়েছে...শুরুর ইন্টার্ভিউ অংশ বোকা বোকা ...একমাত্র মনিরা কায়েসের কথা ছাড়া কারো লেখায় ভাবার কিছু পেলাম না... অন্যদের কন্ট্রাডিকশন উদ্ধৃত করে দেখানো যায় যা আপাতত করছিনা...ইমতিয়ার শামীম,মামুন হুসাইন ইনারা কিছুটা ভারসাম্য রেখেছেন...
তবু তিনি, কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর,কথা সম্পাদক আমার আমাদের দেশের কমলকুমার আগ্রহের একটা নিরিখ করতে চেয়েছেন,একেবারে নতুন পাঠকেরা হয়ত এখান থেকে কিছু দিক নির্দেশনা পাবে তাই তাঁকে অভিবাদন...তবে এটাও না বলে পারছিনা কথা পত্রিকার ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল সংখ্যাটি পড়ে খারাপ লাগলো...সেইসাথে ওপার বাংলার বন্ধুদের জানিয়ে দেয়া গেলো আমাদের কমলকুমার পাঠ কত সীমিত!
কথা-সম্পাদকের প্রতিক্রিয়া
Kamruzzaman Jahangir মনের ঝাল মিটছে তো? আরও মিটাও। আরও লেখো। এই ধরনের কিছু একটা যে তুমি করবে, তা আন্দাজ করতে ছিলাম। দুই-একজনকে অলরেডি আমার আন্দাজের কথা বলেও ফেলেছি। তুমি এসবই পারো।
গলা্য় একখান ঢোল বাইন্ধা বাংলা ভাষাভাষী প্রত্যেকের কানে তোমা্র অমৃত বানী পৌঁছাও। হাসান, রফিক কায়সার, সাজ্জাদ শরিফ, ওয়াসি, চঞ্চল আশরাফ, আহমেদ মুনির, ভাগ্যধন বড়ুয়া, রিপন মিনহাজ, নির্ঝর নৈশঃব্দ্যরা তো বোকা বোকা কথাই বলবে। আর তুমি মহান বানী ফেরি করতে আছো! তোমায় অনেক অনেক ধন্যবাদ।
পুনশ্চ : কমলের সাক্ষাৎকার যে পুনর্পাঠের অংশ তা সূচিতেই বলা আছে। ভিতরেও তা অনুপুঙ্খ উল্লেখ আছে। Saikat Dey
10 hrs · Edited · Like
আমার উত্তর
ওগো দাদা,আমি মনের ঝাল মেটাইনি...একজন পাঠক হিসেবে আমার প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি মাত্র নাকি একজন লেখক আর সম্পাদক হিসেবে সেটুকু নেয়ার সক্ষমতা হারিয়েছেন আপ্নি...আমি বোকা বোকা বলতে চেয়েছি মুলত আপনার প্রশ্নগুলিকে...হাসান বা ওয়াসি বা সাজ্জাদ-ইনারা তো এক একটা নাম এবং কথা যা বলেছেন তা কন্ট্রাডিক্টরি,আপনি যে আজকাল লেখকের কাজের চেয়ে নামের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়েছেন তাও আমার আগে থেকেই ধারণা ছিলো এবং আমি এই ইসুতে তার নমুনা পেলাম...সাক্ষাতকারটা সরাসরি স্ক্যান করে বসিয়ে,যেখান থেকে নেয়া তার উল্লেখ না করে(যে উল্লেখের কথা বলছেন সেটা হচ্ছে যে পত্রিকা থেকে আপনি নিয়েছেন তারা কোথা থেকে নিয়েছে তার খবর কেননা বোঝা যাচ্ছে মাছি মারা কেরাণীর মত সেটারো বানান শুদ্ধির দায় আপনি পালন করেননি এবং বলার দরকার মনে করেননি লেখাটা কোথা থেকে নেয়া...তার উপর সাক্ষাৎকার কে নিয়েছেন সেইটারও হদিশ নেই কোনো...এই হল সম্পাদনা!একজন সম্পাদক ২০০৯ সালে লিটল ম্যাগাজিন মেলায় অনিয়মের প্রতিবাদে অনুষ্ঠান স্থল ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন আরেক সম্পাদক মেলার আগের দিন আয়োজকের মুখোশ উন্মোচন করার কথা বলে পরের দিন পদক নিয়েছিলেন মুখোশ পরা লোকটার কাছ থেকেই পুরষ্কার নিয়েছিলেন,আজ কয়েক বছরের মাথায় দেখা যাচ্ছে পত্রিকা দুটি সমগোত্রীয়...বেশ...আমি সেই প্রতিবাদী সম্পাদককে মিস করছি জাহাঙ্গীর ভাই...আমি আমার সৎ পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখেছিলাম কাল তাও আপনার গায়ের ঝাল ঝাড়া মনে হলে আমার কিছু করার নেই...আসলে কি জানেন আপনার চারপাশে যারা ঘুরে বেড়ায় তাদের মত আমি নিরব থেকে আপনার প্রতি কথায় সায় দিতে পারিনা তো তাই আপনার গায়ের ঝাল ঝাড়া মনে হচ্ছে...আমার কাছে বন্ধুত্ব হচ্ছে পারস্পরিক মত প্রকাশের স্বাধীনতার বন্ধুত্ব...একটা আলোচনা হজম করতে পারলেন না!...আপনাকে ক্ষিপ্ত করে বা না করে আমার লাভ কি!আপনি কি সাজ্জাদ শরিফ!আর আপনার কি কখনো মনে হয়েছে আমি কথায় বা আর কোথাও লেখা ছাপানোর জন্য লালায়িত?শাহবাগ আন্দোলন আর শাহবাগ বিরোধীতার পেট্রোনাইজারের কোলে বসে থাকা দুইটাই আমাকে দিয়ে সম্ভব!এজ এ হিউম্যান বিং আপনি একজন অসামান্য মানুষ জাহাঙ্গীর ভাই,কিন্তু সৃজনশীল মানুষ হিসেবে আপনি ক্রমশ পালটে যাচ্ছেন...আমার কেবলি সুবিমল মিশ্রের 'বুর্জোয়া কাগজ যেভাবে সম্ভাবনাময় লেখককে ব্যাবহার করে'- গল্পটা মনে পড়ে যাচ্ছে।অবশ্য এই বিশ্বায়নের বাজারে কেই বা বুর্জোয়া আর সবই কোমল পদতল আর আমাদের কাজ হচ্ছে হুমড়ি খেয়ে পরা!আপনি লেখার পাশাপাশি জ্যোতিষ চর্চা করেন জেনেও ভালো লাগল...'মহান বাণী ফেরি' করতে পারলে তো ভালই হত...বাবা সৈকত আনন্দ হয়ে ঝোল ঝাল অম্বল আন্টাসিড সব মিলিয়ে রসে বশে থাকতে পারতাম...'ঢোল' একটা তো আমার কাঁধে শুধু নয় আমার সারা শরীরেই আছে যাতে আমি 'অমৃত বাণী' ফেরি করিনা সব রকম সুবিধাবাদী অবস্থানকে ঘৃণা জানাই... যা হোক,আমি আপনার সম্পাদিত পত্রিকা সম্পর্কে যা বলেছি আমার লেখায় তা বরং পাঠক তলিয়ে দেখুক কিন্তু আপনি যে ভাষায় প্রতিক্রিয়া দেখালেন তা ইতিহাস হয়ে থাকবে...ভালোবাসাসহ... পুনশ্চ-আশা করি আমাদের হপ্তাশেষের হাই হ্যালোতে এসব কোন প্রভাব ফেলবেনা, আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসতে পারব নইলে আমরা পরস্পরের কাছেই ছোট হয়ে যাবো...ভালোবাসা জানবেন..
এই আলোচনাটি এখানে রেখে দিলাম যদি কেউ কোন মন্তব্য করেন...
30 ডিসেম্বর 2014, 09:29 AM-এ '
আমার উত্তরের পরেই আমি ব্লকড হয়ে যাই ও পরে উপরের কপি করা অংশ পোস্ট করি। এরপর মাঝেমাঝে রাস্তাঘাটে দেখা হয়। আমি হালকা করে নেয়ার চেষ্টা করলেও তিনি করেন না। দেখেও না দেখার ভান করেন। কষ্ট পাই। কেননা, কমলকুমার সংখ্যাটা সম্পর্কে আমি ভুল কিছু যে বলিনি তা সংখ্যাটা হাতে নিয়েই বলা সম্ভব। আর লেখক তালিকাও কী অবাক করা!
৫
একটি ভাষা, আমরা যারা তাঁর নিবিষ্ট পাঠক,বুঝতে পারি তিনি আযাপন অনুসন্ধান করে যাচ্ছিলেন যা কিনা একজন লেখকের ব্রত এবং কাছাকাছি গিয়েছিলেন 'হৃদমাঝার' উপন্যাসে। দেখবেন,তাঁর সকল লেখার ভাষার চেয়ে এটার চলনভঙ্গি একেবারেই আলাদা। লেখক হিসেবে একটা চলিষ্ণু,গ্রহিষ্ণু সত্তা তাঁর বরাবরই ছিলো। পাঠের, চিন্তার,অনুজদের ঋদ্ধ করবার জন্য নিজের সময় বের করা,নিয়মিত সমকালীন লেখক ও অগ্রজ লেখকদের সম্পর্কে মতামত লিপিবদ্ধ করা তিনি প্রায় 'দায়িত্বের' জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই সাময়িক লেখাগুলোর( বুকরিভিউ,মতামত) একটি সংকলন হওয়া জরুরি ( এই সংকলনে থাকতে পারে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার সব সম্পাদকীয়),তাহলে আমরা একজন মানুষের মননশীলতার পরিবর্তন,পরিবর্ধনের একটা মানচিত্র যেমন পাবো তেমন পাবো একজন সুজনদক্ষ মানুষ নিজেকে কি করে তৈরি করে তোলেন সে বিষয়ে চিন্তাভাবনার স্পষ্ট কিছু হাতিয়ার। তবে তার জন্যে প্রয়োজন অনুভবী প্রকাশক ও যোগ্য সম্পাদক। শেষদিকে সম্ভবত কোনো এক অনির্দেশ্য বোধ দ্বারা তিনি তাড়িত হচ্ছিলেন। আমরা দেখি, তাঁর সর্বশেষ প্রবন্ধ বইটি যা কিনা বেশ নামী প্রকাশক পেয়েছিলো,বেঙ্গল প্রকাশিত 'কমলনামা' বইটিতে সেই দ্রুততার ছাপ। বলা বাহুল্য,কমলকুমার মজুমদার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে কমলবিষয়ে প্রবল আগ্রহের যে জোয়ার আমরা দেখেছি এই বইটি তাঁরই একটি সংযোজন। মনোযোগী পাঠক খেয়াল করলে দেখবেন, প্রথম দুইটি দীর্ঘ প্রবন্ধ মূল প্রবন্ধ। পরের আট উপন্যাস নিয়ে যে আটটি ছোটো গদ্য তৈরি হয়েছে সেগুলোতে বৃহৎ বৃহৎ অংশ আগের দুটি প্রবন্ধ থেকেই সরাসরি বসিয়ে দেয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো কোনো অংশ একাধিকবার এসেছে সেইসব অংশ। স্থানাভাবে বিশদ লিখলাম না। পাঠক পড়লে বুঝবেন। আমার ধারণা, শেষদিকে তিনি এক ধরণের অস্থিরতায় ভুগছিলেন,চাইছিলেন একসাথে অনেক বলবার কথা একসাথে বলতে।এই মানসিক চাপ তাঁর শরীর ও মনকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। আমাদের সবার খোঁজ নিয়মিত রাখলেও নিজে জনকল্যাণমুখী ডাক্তার হলেও নিজের খবর রাখতেন না। তিনি সার্বক্ষণিক সাহিত্যকর্মী হবার যে মানসিক চাপ তা থেকেই আসলে নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি। ছোটো কাগজের দার্শনিক যে চিন্তা তাঁর শুরুতে ছিলো তা থেকে ক্রমে তিনি সরছিলেন ( সেটি ভালো বা খারাপ আমি বলার কেউ নই,তবে তাঁর সরতে থাকা খেয়াল করলেই বোঝা যাবে) আর ক্রমাগত তিনি নিজেকে হারাচ্ছিলেন।
৬
সেই সাত মার্চে আমি জয়ন্ত জিল্লুর পোস্ট দেখে উনার নাম্বারে ফোন করি ও তাঁর মেয়ের পৃথিবী স্তব্ধ হওয়া কান্না শুনি। আর বুঝি,যে সাহিত্যগত বিতর্ক আমাদের মধ্যে দূরত্ব সূচিত করেছিলো তা ঠিক করবার সুযোগ নিয়তি আমার কাছে থেকে কেড়ে নিলো। অনুবাদক অদিতি কবির খেয়া আমার অতি প্রিয় মানুষ। আমার আর জাহাঙ্গীর ভাইকে পছন্দ করেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন পরে, জাহাঙ্গীর ভাই মেলা থেকেই ফিরে আমাকে ফোন করতেন। তাঁর সাথে আমার বিষয়ে বইমেলায় কথা হয়েছিলো। বলেছিলেন, ও একটু অইরকম,আমি জানি। অন্তত এই কথাটুকু যদি না হতো আমি সারাজীবন ক্ষমা করতে পারতাম না। অবশ্য এখনো পেরেছি তা নয়। আজ মনে হয়,মানুষের আবেগ বলেও একটা জিনিস আছে। সব ক্রিটিক্যালি দেখতে নেই।
পুনশ্চ:
কিশোরগঞ্জের মেয়ে শুনেই আমি বিয়েতে রাজী হয়ে যাই কেবল এইটুকু ভেবে সেইখানে আমার জাহাঙ্গীর ভাইয়ের বাড়ি। বিয়ের আটদিন পরেই আমি প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি যাই। পরদিনই কন্যার তুতোভাইকে নিয়ে বাজিতপুর যাই। তাঁর শেষ শয্যার সামনে খানিক দাঁড়াই। সামনেই এক বিশাল পুকুর। অনেক নিরিবিলি। তবে আগাছা জন্মেছে। একটা স্মৃতিফলক দরকার ছিলো। এইখানে দু:খিনী বর্ণমালার একজন প্রেমিক শুয়ে আছেন,এই কথাটা আমরা তাঁর স্পর্শ পেয়েছিলাম তাদের জন্য অন্তত লিখে রাখা দরকার। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের মা,ফর্সামতন গোলগাল মুখ,অনেকটা আমার মায়েরই মতন আমাকে দেখে বলছিলেন অস্ফূটে,আমার জাহাঙ্গীরের মতন আর কাঁদছিলেন। তাঁর ভগ্নীপতি সঙ্গ দিলেন আমাদের। বেরোতে বেরোতে ভাবছিলাম, জাহাঙ্গীর ভাই, আপনাকে আমি ভালোবাসি,সেটা বুঝেই কি আপনি আসন্ন মৃত্যুর আগেই আমাদের ভেতরকার দেয়াল তুলে দিতে চেয়েছিলেন?

