ক্লান্ত, ঘুমহীন
এখন প্রায় সাড়ে তিনটা। জুলাই পঁচিশ৷ অযুত সহস্র বছরের সভ্যতার আরেকটা রাত। এক আশ্চর্য অস্বস্তিমাখা কিম্ভূতকিমাকার রাত। স্মৃতি থেকে কোনোভাবেই রক্তমাখা শব ঝেড়ে ফেলতে না পারা রাত। কেমন আছে অজস্র স্বপ্নবান কম বয়সীদের হারানো পরিবারের স্বজনেরা? অথচ, আমরা ইউটোপিয়ার মধ্যে নেই৷ আমাদের চোখের সামনেই সব ঘটেছে। এবং, তারপরেও কী অবাক করা ব্যাপার আমরা এখনো চক্ষুষ্মান! নতুন প্রজন্মের শব নিয়ে আমরা দর দাম করতে বসেছি স্বাধীন বাংলাদেশের খোলা রাস্তায়।
ইতিহাস ভুলেছি আমরা। ফলত, বিচ্যুতিই আমাদের নিয়তি। শব্দ পরম ব্রহ্ম৷ তবু বুঝতে চাইনি, শব্দের অর্থ সব সময় ব্যাকরণ অনুগামী নয়। সময়ে সময়ে বদলে বদলে বহতা নদী যেমন। আর হায় শব্দ, তুমি কতদূর শুনবে কতদূর তোমায় শোনানো হবে, সেই শব্দের কতদূর অব্দি ইতিহাস আশ্রিত দায় তোমার দুটো নরম ভঙ্গুর কাঁধে চাপিয়ে দেবে কে আর যাপনের কোন মুহূর্তে, তা আগে থেকে বোঝার উপায় নেই৷ যে বন্ধুর সাথে মেঝেতে পাত পেড়ে বসে, একই থালা থেকে তুলে নিচ্ছ ভাত আর তার মা আঁচল দিয়ে তোমারও মুখ মুছে দিচ্ছেন সন্তান বাৎসল্যেই, তুমি যাপনের কোন এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তে ঐ মা-কে করে দিতে পারো সন্তানহারা।
মুক্তি চাই। কার এবং কীসের? কার হাত থেকে? যখন দম বন্ধ হয়ে আসে কোন ঈশ্বরের করুণাঘন মুখ মনে পড়ে? সে মুখ কি ডলার, পাউন্ড, স্টার্লিং কলংকিত আজ? পাদ্রী কি ঘন্টা নাড়তে নাড়তে আমাদের বহু শতাব্দী আগের ধ্বস্ত হয়ে যাওয়া শবের পচা গলা স্তূপ তুলে দিচ্ছেন কোনো পরম স্ত্রোত্রের দোহাই দিয়ে? কোথায় অমর আঙুর বাগান? শিশুরা নিশ্চিন্তে খেলা করে কোন অগাধ প্রান্তরে।
রবীন্দ্রনাথ যখন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত লিখছিলেন, তাঁর কি মনে পড়ছিল নিজের অকাল প্রয়াত মায়ের মুখ? মায়ের বদনখানি মলিন হওয়ার রূপক বুকে ধারণ করে আজ মানচিত্র জুড়ে মৃতের রাশিমালা। অথচ, আমাদেরই ভাই আমাদের সামনে উদ্যত মারণাস্ত্র হাতে৷ তার হাতে এই কিছুদিন আগেও মায়ের আঁচল প্রান্তস্পর্শ ছিলো।
ঘুম আসে না৷ শরীর জুড়ে ক্রন্দন বন্যা। ঈশ্বর মানুষের শরীরকে কেন এতো ভঙ্গুর করে বানালেন! সামান্য দু চারটি মারণাস্ত্রের আঘাতেই রাস্তায় সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানায় দেশমাতৃকাকে? অথচ, আমরা কেউ দেশদ্রোহী নই৷ কে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে, এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্রের উল্টোদিকে দাঁড় করিয়ে দিল! আমরা ত ভালবাসতে চেয়েছিলাম৷ আর হ্যাঁ, বাঁচতেও, দু বেলা খেয়ে, সসম্মানে৷ কিন্তু বার বার নিরুদ্দেশের দিকে হারাতে হচ্ছে কার ভুলে!
তিনটা পঞ্চাশ রাত
জুলাই পঁচিশ

